শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:১৪ অপরাহ্ন

অবশেষে আসছে কাঙ্ক্ষিত পেপ্যাল

Reporter Name
  • Update Time : শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৬ Time View
8

বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক অনলাইন পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম পেপ্যাল চালুর আলোচনা যেন এক দীর্ঘ প্রতীক্ষার গল্প। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বারবার আশার সঞ্চার, উদ্যোগের ঘোষণা, উচ্চপর্যায়ের বৈঠক—কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বারবারই ব্যর্থতা।

তবে এবার প্রেক্ষাপট কিছুটা ভিন্ন। জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরাসরি ঘোষণা দিয়েছেন—বাংলাদেশে পেপ্যালের কার্যক্রম চালু করতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, এমনকি এ লক্ষ্যে একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে।

২০১৬ থেকে অপেক্ষা

বাংলাদেশে পেপ্যাল চালুর আলোচনা শুরু হয় মূলত ২০১০-এর দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে। ২০১৬ সালে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সঙ্গে চুক্তি হয়, এমনকি ২০১৭ সালে ব্যাপক প্রচার প্রচারণা চালিয়ে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়—সব মিলিয়ে তখন বড় ধরনের প্রত্যাশা তৈরি হয়।

কিন্তু সেই সময় বাস্তবে চালু হয় কেবল Xoom—যা পেপ্যালের একটি সহায়ক সেবা। ২০১৭ সালের ১৯ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে PayPal Xoom সেবা। ওই দিন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় রাজধানীর এক অনুষ্ঠানে এ সেবার উদ্বোধন ঘোষণা করেন। এটি দিয়ে প্রবাসীরা বাংলাদেশে অর্থ পাঠাতে পারলেও ফ্রিল্যান্সারদের আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গ্রহণ বা অনলাইন ব্যবসার পূর্ণাঙ্গ সুবিধা কখনোই চালু হয়নি।

পরবর্তী সময়ে ২০২১ সালেও পেপ্যাল চালুর ঘোষণা আসে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে সময়সীমাও নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে ফ্রিল্যান্সারদের কাছে “পেপ্যাল আসছে”—এটি এক ধরনের পুনরাবৃত্ত প্রতিশ্রুতিতে পরিণত হয়।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতির জন্য পেপ্যাল শুধু একটি পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম নয়—এটি বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত হওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন। তারা বলছেন এবারের উদ্যোগ সফল হলে বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সার, উদ্যোক্তা ও ডিজিটাল অর্থনীতির জন্য এটি হতে পারে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন।

কেন বারবার থেমে গেছে উদ্যোগ?

বাংলাদেশে বহুল আলোচিত আন্তর্জাতিক অনলাইন পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম PayPal দীর্ঘদিন ধরেই চালুর আলোচনা থাকলেও বাস্তবে তা কার্যকর হয়নি।

বাংলাদেশে পেপ্যাল চালু না হওয়ার কারণগুলো কেবল প্রযুক্তিগত নয়; বরং এটি একটি জটিল নীতিগত, আর্থিক ও আন্তর্জাতিক কাঠামোর সঙ্গে জড়িত। এ নিয়ে নীতিনির্ধারক, প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ও আর্থিক খাত সংশ্লিষ্টদের মধ্যে নানা ব্যাখ্যা রয়েছে। বিশ্লেষণে দেখা যায়, একাধিক প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কারণের সমন্বয়েই পেপ্যালের কার্যক্রম দেশে চালু করা সম্ভব হয়নি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রধান বাধাগুলোর একটি হলো দেশের আর্থিক লেনদেন ব্যবস্থায় পূর্ণাঙ্গ ‘ফাইন্যান্সিয়াল সেটেলমেন্ট’ কাঠামোর অভাব। অনলাইনে প্রতারণা বা আর্থিক জালিয়াতির ঘটনা ঘটলে তাৎক্ষণিক প্রতিকার দেওয়ার মতো ২৪ ঘণ্টার কোনও কেন্দ্রীয় সাপোর্ট সিস্টেম এখনও গড়ে ওঠেনি। ফলে আন্তর্জাতিক মানের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা অনুপস্থিত রয়ে গেছে।

এছাড়া, ব্যবহারকারীদের নির্ভরযোগ্য পরিচয় ও ঠিকানা যাচাইকরণ (কেওয়াইসি ও অ্যাড্রেস ভেরিফিকেশন) ব্যবস্থার দুর্বলতাও বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। পেপ্যালের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো ব্যবহারকারীর তথ্য যাচাইয়ের ওপর অত্যন্ত নির্ভরশীল হওয়ায় এই সীমাবদ্ধতা তাদের কার্যক্রম পরিচালনায় জটিলতা তৈরি করে।

পেপ্যালের ব্যবসায়িক কাঠামোও এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এটি কেবল একটি পেমেন্ট গেটওয়ে নয়, বরং দ্বিমুখী লেনদেননির্ভর একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল মার্কেটপ্লেস। কিন্তু বাংলাদেশে বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন দীর্ঘদিন ধরে নিয়ন্ত্রিত ও অনেকাংশে একমুখী (ইনওয়ার্ড রেমিট্যান্সনির্ভর) থাকায় এই প্ল্যাটফর্মের পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম চালু করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

নিয়ন্ত্রক দিক থেকেও রয়েছে সীমাবদ্ধতা। বাংলাদেশ ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনে দীর্ঘদিন ধরে কঠোর নীতি অনুসরণ করে আসছে। পেপ্যাল চালুর জন্য প্রয়োজন অবাধ অর্থপ্রবাহ—অর্থাৎ টাকা আসা-যাওয়ার স্বাধীনতা (inflow ও outflow)—যা বর্তমান কাঠামোয় সীমিত।

পরোক্ষ কারণগুলোর মধ্যে আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের ঘাটতিও উল্লেখযোগ্য। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বাংলাদেশ থেকে পেপ্যাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের অনেক উদ্যোগ ভারতের আঞ্চলিক কার্যালয়ের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। এতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া ধীরগতির হয়ে পড়ে এবং প্রত্যাশিত অগ্রগতি ব্যাহত হয়।

সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, পেপ্যাল চালুর ক্ষেত্রে শুধু প্রযুক্তিগত প্রস্তুতিই নয়, বরং নীতিগত সংস্কার, আর্থিক নিরাপত্তা অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক সমন্বয় জোরদার করা জরুরি। যদিও সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচ্চপর্যায়ে একাধিকবার আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছে, তবু এসব মৌলিক সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে না পারায় কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি এখনও অধরাই রয়ে গেছে।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category