বৃহস্পতিবার, ০২ এপ্রিল ২০২৬, ১২:৪১ অপরাহ্ন
শিরোনাম :

ঋতু পরিবর্তনে শিশুদের সর্দি-জ্বরের ঝুঁকি বৃদ্ধি

Reporter Name
  • Update Time : বৃহস্পতিবার, ২ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৬ Time View
মৌসুম পরিবর্তনের এই সময়টাতে অনেক শিশু জ্বর, সর্দি-কাশি, গলা ব্যথা বা শরীর ব্যথা এবং ঠান্ডাজনিত সমস্যায় ভুগছে। প্রতিদিনই এমন শিশুদের সংখ্যা বাড়ছে, আর অনেক অভিভাবকই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছেন— এগুলো কি সাধারণ ঠান্ডা, নাকি আরও গুরুতর কিছু? মূলত এই জ্বর ও ঠান্ডার প্রকোপ বেশিরভাগই ভাইরাসজনিত এবং তা নিজে থেকেই সেরে যায়। তবে এ সময় সচেতনতা ও সঠিক যত্ন নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
প্রথমেই বলতে চাই, ইদানীং শিশুদের মধ্যে যে জ্বর ও ঠান্ডার ভাইরাল সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে, তা মূলত আবহাওয়ার হঠাৎ পরিবর্তনের সময় বেশি হয়ে থাকে। শীত থেকে গরমে কিংবা গরম থেকে বর্ষায় যাওয়ার সময় পরিবেশে ভাইরাসের সংক্রমণ বেড়ে যায়, যা শিশুদের শরীরে দ্রুত প্রভাব ফেলে। কারণ, প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে কম থাকে। এই ধরনের সংক্রমণ সাধারণত খুব বেশি জটিল হয় না এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নিজে থেকেই সেরে যায়। তবে এর উপসর্গগুলো অনেক সময় অভিভাবকদের জন্য চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
ভাইরাসজনিত জ্বরের লক্ষণগুলো বেশ পরিচিত। হালকা থেকে মাঝারি জ্বর, নাক দিয়ে পানি পড়া, শুকনো বা ভেজা কাশি, গলা ব্যথা, কখনো মাথা বা শরীর ব্যথা— এসবই সাধারণ উপসর্গ। অনেক ক্ষেত্রে শিশুদের খাওয়ার রুচি কমে যায়, তারা দুর্বল হয়ে পড়ে, কিছুটা অস্থিরতা দেখা দেয় এবং স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি বিরক্ত বা অস্থির আচরণ করে। তবে এই লক্ষণগুলো সাধারণত ৩ থেকে ৫ দিনের মধ্যে ধীরে ধীরে কমে আসে।
তবে সব জ্বরকে হালকাভাবে নেওয়া ঠিক নয়। যদি কোনো শিশুর জ্বর টানা ৫ দিনের বেশি থাকে, খুব বেশি তাপমাত্রা (১০২ ডিগ্রি ফারেনহাইটের বেশি) হয়, শিশুর শ্বাস নিতে কষ্ট হয়, খিঁচুনি দেখা দেয় বা সে অস্বাভাবিকভাবে নিস্তেজ হয়ে পড়ে তা হলে দেরি না করে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। এসব ক্ষেত্রে অন্য কোনো জটিল সংক্রমণ থাকতে পারে, যা দ্রুত শনাক্ত করা জরুরি।
চিকিৎসা নিয়ে একটি সাধারণ ভুল ধারণা আমি প্রায়ই দেখি।
অনেক অভিভাবক মনে করেন, জ্বর হলেই অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন। কিন্তু ভাইরাসজনিত জ্বরের ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিক কোনো উপকার করে না। বরং অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে শিশুর শরীরে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে এবং ভবিষ্যতে ওষুধের কার্যকারিতাও কমে যেতে পারে। তাই আমি সবসময় পরামর্শ দিই, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার না করতে।
ভাইরাল জ্বর বা ঠান্ডার ক্ষেত্রে ঘরোয়া যত্নই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শিশুকে পর্যাপ্ত বিশ্রামে রাখা, হালকা গরম পানি পান করানো, তরল খাবার দেওয়া, সহজপাচ্য ও পুষ্টিকর খাবার খাওয়ানো এসব বিষয় খুবই কার্যকর। জ্বর বেশি হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী জ্বর কমানোর ওষুধ দেওয়া যেতে পারে।
একই সঙ্গে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। ছোট ছোট অভ্যাসই বড় ধরনের সুরক্ষা দিতে পারে। শিশুদের নিয়মিত হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা, বাইরে থেকে এসে হাত-মুখ ধোয়া, অসুস্থ ব্যক্তির সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা এসব অভ্যাস শিশুদের সংক্রমণ থেকে অনেকটাই রক্ষা করে। স্কুল বা ডে-কেয়ারে গেলে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে, তাই শিশু অসুস্থ থাকলে তাকে কয়েক দিন বাসায় বিশ্রামে রাখাই ভালো।
অনেক সময় অভিভাবকরা আতঙ্কিত হয়ে নিজেরা বিভিন্ন ওষুধ খাওয়াতে শুরু করেন, যা শিশুর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। বিশেষ করে অ্যান্টিবায়োটিক, কফ সিরাপ বা অন্যান্য ওষুধ ব্যবহারের আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। প্রতিটি শিশুর শারীরিক অবস্থা আলাদা এবং সেই অনুযায়ী চিকিৎসাও ভিন্ন হতে পারে। কারণ, ভুল ওষুধের ব্যবহার শিশুর শরীরে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে।
শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সুষম খাদ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফল, সবজি, দুধ, ডিম, ডাল এসব খাবার নিয়মিত খেলে শরীর শক্তিশালী হয় এবং সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারে। পাশাপাশি পর্যাপ্ত ঘুম ও নিয়মিত খেলাধুলা শিশুর সামগ্রিক সুস্থতার জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
প্রকুতপক্ষে ভাইরাল জ্বর বা ঠান্ডা নিয়ে অযথা আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন থাকা জরুরি।
এই ধরনের রোগ শিশুদের জন্য খুব অস্বাভাবিক কিছু নয়। এটি একটি সাধারণ স্বাস্থ্য সমস্যা, যা সঠিক যত্ন ও সচেতনতার মাধ্যমে সহজেই মোকাবিলা করা সম্ভব। আতঙ্কিত না হয়ে লক্ষণগুলো খেয়াল রাখা এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়াই হতে পারে শিশুর সুস্থতার সবচেয়ে বড় নিশ্চয়তা।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category