সিডনিতে প্রবাসী বাঙালির হৃদয়ে আবারও জেগে উঠল বাংলা নববর্ষের স্পন্দন। ব্যস্ত শহরের মাঝেই একদিনের জন্য যেন তৈরি হয়েছিল ছোট্ট এক টুকরো বাংলাদেশ রঙে, গন্ধে, সুরে আর মানুষের মিলনে।
১১ এপ্রিল, শনিবার, সিডনির ওয়ালি পার্কে গাংচিল মিউজিকের আয়োজনে অনুষ্ঠিত “নিরালা হোল্ডিংস বৈশাখী মেলা ২০২৬” শুধু একটি উৎসব ছিল না, এটি ছিল প্রবাসে শিকড়কে ছুঁয়ে দেখার এক গভীর আবেগময় উপলক্ষ্য। সকাল থেকেই মানুষের ঢল নামে মেলায়। পরিবার, বন্ধু, শিশু-কিশোর সবাই মিলে যেন খুঁজে নিচ্ছিল নিজেদের সংস্কৃতির হারানো উষ্ণতা।

পুরো আয়োজনের সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন এই মেলার প্রাণপুরুষ টাবু সঞ্জয়, যার পরিকল্পনা ও নেতৃত্বেই মেলাটি পেয়েছে পূর্ণতা। বিকেলের দিকে যখন মঞ্চে শুরু হয় সাংস্কৃতিক আয়োজন, তখন পুরো পরিবেশ বদলে যায় এক প্রাণবন্ত উৎসবে। নাহিদা সুলতানা নুশরাত জাহান স্মৃতি ও মিরাজের সাবলীল ও প্রাণচঞ্চল সঞ্চালনায় অনুষ্ঠান এগিয়ে চলে ধারাবাহিকভাবে। জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে সূচনা হলেও, এরপর প্রতিটি পরিবেশনা যেন দর্শকদের হৃদয়ের তারে আলতো ছোঁয়া দিয়ে যায়।

জাতীয় সংগীত পর পরই মঞ্চে একে একে পরিবেশিত হয় বৈচিত্র্যময় আয়োজন। একক সঙ্গীতে আরশি ও নিলুফার ইয়াসমিন দর্শকদের মুগ্ধ করেন। রোখসানা বেগমের তত্ত্বাবধানে ‘কিশলয়-কচিকাঁচা’ দলের শিশুদের পরিবেশনা ছিল প্রাণবন্ত ও দর্শকনন্দিত।

কবিতা আবৃত্তিতে অংশ নেন শহিদুল আলম বাদল ও ফয়জুন নাহার পলি আর সঙ্গীতে মুগ্ধতা ছড়ান অন্তরা সিনহা ও রত্না কর। দলীয় নৃত্যে অংশ নেন সামান্থা, করিমা ও রাইমা। এছাড়া কুমকুম, মিশা, সুইটি, পারমিতা, আনিশা ও অস্রিতার নৃত্য পরিবেশনা দর্শকদের আকৃষ্ট করে রাখে পুরো সময়জুড়ে।
ব্যান্ড সংগীতে ছিল ভিন্নমাত্রা—‘স্প্ল্যাশ ব্যান্ড’ ও সিডনির ‘ক্রিস্টি ব্যান্ড’-এর পরিবেশনায় মেলা প্রাণ ফিরে পায় এক উচ্ছ্বাসময় সমাপ্তিতে। ‘বন্ধু সভা’ ব্যান্ড ফ্লকের পরিবেশনাও ছিল দর্শকদের কাছে উপভোগ্য।
ধর্মীয় দিক বিবেচনায় রেখে মাগরিবের নামাজের জন্য নির্ধারিত স্থানের ব্যবস্থাপনা তত্ত্বাবধান করেন রানা শরীফ, যা আয়োজনকে আরও সুশৃঙ্খল করে তোলে।

মেলার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল স্পন্সরদের সম্মাননা প্রদান। আয়োজক কমিটির পক্ষ থেকে টাবু সঞ্জয় সম্মাননা ক্রেস্ট তুলে দেন নিরালা হোল্ডিংসের কর্ণধার রানা শরীফ এবং স্টার কিডসের পরিচালক খায়রুল ইসলামের হাতে।

এই বৃহৎ আয়োজনের টাইটেল স্পন্সর ছিল নিরালা হোল্ডিংস। সহযোগিতায় ছিল ক্যান্টারবেরি-ব্যাংকস্টাউন সিটি কাউন্সিল ও ওমেন কাউন্সিল অস্ট্রেলিয়া। এছাড়া Raine & Horne Ingleburn, স্টার কিডস, Bangladesh Travels এবং Luminedge ছিল অন্যান্য স্পন্সর।

মেলায় ২০টিরও বেশি পোশাকের স্টল ও ১৫টির বেশি দেশীয় খাবারের স্টল ছিল, যেখানে সারাদিনই ছিল ক্রেতাদের ভিড়। শিশুদের জন্য ছিল বিভিন্ন রাইড, যা পরিবারগুলোর জন্য মেলাটিকে করে তোলে আরও আকর্ষণীয়।

আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, এই আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য শুধু উৎসব উদযাপন নয় প্রবাসে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মকে বাংলা সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া। তাদের এই প্রচেষ্টা যে সফল, তা দর্শকদের উপস্থিতি ও অংশগ্রহণই প্রমাণ করে।

দিনশেষে যখন মঞ্চে সংগীতের তালে তালে শেষ হয় আয়োজন, তখনও মানুষের ভিড় কমেনি। বরং অনেকের চোখে-মুখে ছিল এক ধরনের তৃপ্তি যেন কিছুটা সময়ের জন্য হলেও তারা ফিরে গিয়েছিলেন নিজের শিকড়ে।
ওয়ালি পার্কের এই বৈশাখী মেলা প্রমাণ করল, দূরত্ব যতই হোক সংস্কৃতি, স্মৃতি আর পরিচয়ের বন্ধন কখনও ছিন্ন হয় না। প্রবাসের মাটিতেও তাই বৈশাখ আসে, ঠিক ততটাই উজ্জ্বল হয়ে, যতটা আসে বাংলার আকাশে।