বৃহস্পতিবার, ২৫ জুলাই ২০২৪, ০৩:০৮ অপরাহ্ন

স্ট্রেস-কি,কেন ও প্রতিকার

মঞ্জুশ্রী মিতা
  • Update Time : সোমবার, ১ এপ্রিল, ২০২৪
  • ১০৭ Time View

আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে আমরা একটি অতি পরিচিত বিষয় নিয়ে আলোচনা করবো। এই সমস্যা ইতিমধ্যে যেভাবে প্রকট হয়ে উঠছে এবং ভবিষ্যতে যে তা আরো ভয়ানক হয়ে আমাদের জীবনে আসতে চলেছে তা আমরা সকলেই আজ নিশ্চিত। স্ট্রেস কথাটি আজ আমাদের জীবনে এতটাই ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে যে এরচেয়ে বহুল ব্যবহৃত শব্দ বোধহয় এ মুহূর্তে আর একটিও নেই।
প্রথমেই অত্যন্ত প্রয়োজনীয় কথাটা জেনে রাখা ভালো যে আমাদের প্রতিদিনকার জীবনে প্রতিনিয়ত চলতে থাকা হাজারো চাপ আর স্ট্রেস নামক অসুখকে কিন্তু গুলিয়ে ফেললে চলবে না। রোজকার জীবনে চাপ নেই এমন ব্যক্তি আজকের পৃথিবীতে বিরল। কিন্তু চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় স্ট্রেস শব্দটির যে অসুখ-নিহিত অর্থ আছে সেটাই আমাদের আজকের আলোচনার মূল বিষয়। মানসিক চাপ সহ্য ক্ষমতার বাইরে গিয়ে যখন ক্ষতি বা অসুখের আকার নেয় তাকে এই আলোচনায় আমরা স্ট্রেস বলে উল্লেখ করবো।
কোনো চাপকে স্ট্রেস হিসেবে গণ্য করতে হলে সেটা একটা মাত্রা ছাড়াতে হয়।
স্ট্রেস-এর বিভিন্ন মাত্রাকে বিজ্ঞানী গিলিয়ার্ড সুন্দরভাবে বর্ণনা করেছেন। যেমন:
Input function: কর্মক্ষেত্রের চাপ, যেমন, কম সময়ে বেশি কাজ করা, কাজে নির্ভুল থাকার চাপ, প্রতিকূল পরিবেশে কাজ বা তীব্র মানসিক আঘাত/অশান্তির মধ্যে কাজ।এতে করে যা হতে পারে-
Output function: ব্যক্তির নিজস্ব অনুভব (যা ব্যক্তিবিশেষে বিভিন্ন রকম হতে পারে) ও তার আচরণে বদল।
স্ট্রেস-এর প্রভাব আমাদের জীবনে যেভাবে পড়ে তাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় মূলত তিনভাগে ভাগ করা যায়:
মানসিক
শারীরিক ও
সামাজিক
মানসিক স্ট্রেস থেকে অনেকসময় শারীরিক রোগের উৎপত্তি হয় আর সামাজিক ক্ষেত্রে স্ট্রেস-এর প্রভাব বোধহয় সবথেকে বেশি। সম্পর্কে জটিলতা থেকে ক্রমাগত সম্পর্কের ভেঙ্গে যাওয়া, বন্ধুহীনতা, পরিবার ভেঙ্গে যাওয়া, অনাকাঙ্ক্ষিত সম্পর্কে জড়িয়ে পড়া এবং সহজেই নেশার কবলে পড়ে যাওয়া আমাদের সমাজে একেবারেই সাধারণ দৃশ্য।
মূলত যে দুটো পদ্ধতিতে এই মানসিক চাপের প্রভাব কমবেশি শরীরের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে তা হলো:
১।এন্ডোক্রিন বা হরমোন সিস্টেম
২।ইমিউন বা প্রতিরক্ষা সিস্টেম
হরমোন সম্পর্কে আমরা সকলেই আজকের দিনে অল্পবিস্তর জানি।
আমাদের শরীরে হরমোনগুলির কার্যকারিতা সাধারণত একে অন্যের উপর পারস্পরিক ভাবে নির্ভরশীল।
শরীরের ভিন্ন হরমোনগুলির মধ্যে স্ট্রেস বিষয়ক যে হরমোনগুলোর কথা জানা প্রয়োজন তা হলো HPA axis এবং HPG axis।

HPA axis আমাদের শরীরে বিভিন্নভাবে কাজ করে। সামগ্রিকভাবে শরীরের ক্রিয়া-প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে স্মৃতি, নতুন জিনিস শেখা, অনুভূতি, এমনকি ব্যাথা ও ঘুমের মতো প্রাথমিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়াগুলিও অনেকাংশে এই axis-এর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে। এই প্রক্রিয়াটির স্বাভাবিক কর্মক্ষমতায় ব্যাঘাত ঘটলে তা বহুক্ষেত্রেই মন, চিন্তা বা উৎকণ্ঠার বিভিন্ন অসুবিধে বা অসুখে পরিণত হতে পারে। এমনকি সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা, স্বাভাবিক বুদ্ধি ইত্যাদিতেও ব্যাঘাত ঘটতে পারে।

HPG বা Hypothalamo-pituitary-gonadal axis অন্যদিকে মানুষের যৌনক্ষমতার স্বাভাবিক পরিণতি প্রাপ্ততার সাথে সাথে সমগ্রভাবে ভালো থাকা, মানসিক সুখ-শান্তি ও কর্মদক্ষতা বজায় রাখতেও বিশেষ ভূমিকা পালন করে। এ প্রসঙ্গে এই axis-এর অন্তর্গত testosterone আর Di-hydro Epiandrosterone হরমোনটির অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সাম্প্রতিক গবেষণাতে দেখা যাচ্ছে, উৎকণ্ঠা, ভয় পাওয়া ও তাকে সময়ের সাথে জয় করা এবং স্মৃতিশক্তি রক্ষা করায় এই হরমোনটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। স্মৃতিশক্তি এবং অভিজ্ঞতা থেকে আমরা যা শিখি, তা থেকে আমাদের ভবিষ্যতে আসতে চলা স্ট্রেস ও তার সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কে সাবধান হতে পারি ও পুরোনো অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে আমরা সেই স্ট্রেস-কে আরো ভালোভাবে মোকাবিলা করতে পারি | সঙ্গত কারনেই, এই দুই অক্ষ যখন ঠিকভাবে কাজ করে না তখন এই সমস্ত কাজগুলিও ঠিক ভাবে সম্পন্ন হয় না|এই দুই অক্ষ-ই শারীরবৃত্তীয় স্বাভাবিক অবস্থায় পূর্ণ মাত্রায় বা বলা ভালো সঠিক মাত্রায় কাজ করে থাকে এবং শরীরের স্বাভাবিক ভারসাম্য বজায় রাখে। মুশকিল তখনি হয় , যখন স্ট্রেস-এর কারণে এই দুই অক্ষ বেশি মাত্রায় কাজ করতে থাকে, যার ফল স্বরূপ কিছু হরমোন অধিক পরিমাণে ক্ষরণ হতে থাকে। এতে শরীরের স্বাভাবিক ভারসাম্যটি নষ্ট হয়ে যায়, ফলে নেগেটিভ ফিডব্যাক পদ্ধতি টি সম্পূর্ণ ভাবে ভেঙে পড়ে এবং করটিসল জাতীয় হরমোন আরো বেড়ে গিয়ে স্ট্রেস-এর বিভিন্ন উপসর্গগুলি তৈরি করে।
স্ট্রেস কথাটি সাধারণত নেতিবাচক অর্থে ব্যবহৃত হলেও কখনো কখনো সদর্থক অর্থেও প্রযোজ্য হতে পারে। স্ট্রেস নিয়ে গবেষণায় যে বিজ্ঞানীকে পথিকৃৎ মানা যেতে পারে, সেই বিজ্ঞানী Hans Selye স্ট্রেস-কে দুভাগে ভাগ করেছেন: ইউস্ট্রেস (eustress) এবং ডিস্ট্রেস (distress)1। ইউস্ট্রেস বা পজিটিভ স্ট্রেস-এ আমাদের শারীরিক বা মানসিক অভিযোজন ক্ষমতা অনেকখানি বেড়ে যায়, এবং শরীর ও মন প্রতিকূল অবস্থার সাথে লড়তে অনেকখানি তৈরী হয়ে ওঠে।
মানসিক চাপ সামলানোর জন্য আমরা সকলেই কোনো না কোনো উপায় নিয়েই থাকি। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় সেই উপায়গুলিকে কোপিং স্কিল (coping skill) বলা থাকে। কোপিং স্কিল বা কঠিন পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নেওয়ার নিজস্ব পদ্ধতিগুলিকে মূলত দুভাগে ভাগ করা যায়:

ইমোশন ফোকাসড কোপিং (Emotion focused coping): বাংলায় একে আবেগজনিত মানসিক প্রক্রিয়া বলা যেতে পারে। এখানে লক্ষ্য থাকে মূলত তাৎক্ষণিক উপশম আর তার জন্য প্রয়োজনীয় আবেগের পরিবর্তন করা।
প্রব্লেম ফোকাসড কোপিং (Problem focused coping): কোপিং বা মানিয়ে নেওয়া তখনি আদতে ফলপ্রসূ হয় যখন স্ট্রেস-এর সময় স্ট্রেস-জনিত অনুভূতিকে বাদ দিয়ে কারণটিকে দেখতে আমরা সমর্থ হই এবং সেই কারণটিকে কী করে কমানো যায় বা দূর করা যায়, তাতে মনোনিবেশ করি। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একেই প্রব্লেম ফোকাসড কোপিং বলে। অর্থাৎ, শুধু আবেগের দ্বারা চালিত না হয়ে কারণটি সমাধানের চেষ্টা করলে শেষ অব্দি অসুবিধা আর তার সাথে থাকা অনুভূতি, দুই মুশকিলেরই আসান করে।
পজিটিভ হেলথ / হেলথ রিসার্ভ / পজিটিভ সাইকোলজি (positive health / health reserve / positive psychology): পজিটিভ সাইকোলজি-র ধারণাটি মনোবিজ্ঞানের জগতে ক্রমশ জায়গা করে নিতে থাকে। সাইকোলজি কেবল মানুষের খামতিগুলি দূর করার চেষ্টা না করে কোনো ব্যক্তিবিশেষের ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য ও সদর্থক দিকগুলিকে আরো শক্তিশালী করে তোলে। সহজভাবে পজিটিভ সাইকোলজি-র চর্চার মাধ্যমে আমরা সকলেই নিজের মানসিক ও আত্মিক অবস্থার উন্নতি ঘটাতে পারি।
স্ট্রেস কমাতে আর কী করতে পারি আমরা?আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার কিছু বিষয়ে বিশেষ নজর দিলে স্ট্রেস অনেকটাই কমে যাবে।যেমন-
১।খেলাধুলা ও কায়িক পরিশ্রম
২।পর্যাপ্ত ঘুম
৩।সঠিক খাদ্যাভ্যাস
পাশে এমন কোনো বন্ধু বা কাছের কেউ থাকা প্রয়োজন।সঠিক সংসর্গ ও সম্পর্কের উষ্ণতা অনেকাংশেই আমাদের মানসিকভাবে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে।সেই সাথে নিজের পছন্দের কোনো কাজ নিয়ে নিজেকে ব্যস্ত রাখাও স্ট্রেস নামক এই চাপ থেকে অনেকটাই দূরে রাখতে পারে।
তাই নিজেকে ভালোবাসুন,নিজের প্রতি যত্নবান হোন স্ট্রেসমুক্ত জীবন যাপন করুন।
তথ্যসূত্র:
১।Dr. Hans Selye , Journal of Human Stress, 1975
২।Yerkes R.M. Dodson J.D, Journal of Comparative Neurology and Psychology(1908)
৩। Dr Tonoy Maiti

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category