ভারতে প্রথমবারের মতো ডেঙ্গু প্রতিরোধী টিকার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। দেশটির ড্রাগ কন্ট্রোলার জেনারেল (ডিসিজিআই) জাপানের ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান তাকেদা বায়োফার্মাসিউটিক্যালসের ডেঙ্গু টিকা ‘কিউডেঙ্গা’বাজারজাতের অনুমতি দিয়েছে। ফলে এটি হতে যাচ্ছে ভারতে অনুমোদন পাওয়া প্রথম ডেঙ্গু টিকা।
তাকেদার প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ৪ থেকে ৬০ বছর বয়সী ব্যক্তিরা এই টিকা নিতে পারবেন। তিন মাসের ব্যবধানে দুই ডোজে টিকাদান সম্পন্ন করতে হবে। টিকাটি ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি সেরোটাইপের বিরুদ্ধেই সুরক্ষা দিতে সক্ষম।
কোম্পানিটির দাবি, আগে কেউ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে থাকুক বা না থাকুক, সবাই এই টিকা নিতে পারবেন। টিকা দেওয়ার আগে ডেঙ্গু সংক্রমণের ইতিহাস জানতে কোনো প্রাক্-টিকাদান পরীক্ষা (প্রি-ভ্যাকসিনেশন স্ক্রিনিং) প্রয়োজন হবে না।
ভারতে এমন সময় এই টিকার অনুমোদন দেওয়া হলো, যখন দেশটিতে ডেঙ্গু একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যায় পরিণত হয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত দুই দশকে ভারতে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ১১ গুণ বেড়েছে। বিশ্বের মোট ডেঙ্গু রোগীর প্রায় এক-তৃতীয়াংশই ভারতের বাসিন্দা। যদিও বিভিন্ন গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে আরও অনেক বেশি হতে পারে।
ভারতে কিউডেঙ্গার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে তাকেদার বৈশ্বিক ক্লিনিক্যাল উন্নয়ন কর্মসূচির তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে। এ কর্মসূচির আওতায় ফেজ-১, ফেজ-২ ও ফেজ-৩ মিলিয়ে মোট ১৯টি ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল পরিচালিত হয়েছে। এতে ডেঙ্গুপ্রবণ ও ডেঙ্গু-অপ্রবণ বিভিন্ন অঞ্চলের ২৮ হাজারের বেশি মানুষ অংশ নেন। এর মধ্যে ফেজ-৩ ট্রায়ালে ডেঙ্গুপ্রবণ আটটি দেশের ২০ হাজারের বেশি অংশগ্রহণকারী ছিলেন।
কোম্পানির তথ্য অনুযায়ী, দ্বিতীয় ডোজ নেওয়ার ১২ মাস পর পরীক্ষাগারে নিশ্চিত ডেঙ্গু প্রতিরোধে টিকাটির কার্যকারিতা ছিল ৮০ দশমিক ২ শতাংশ। একই সঙ্গে ডেঙ্গুজনিত কারণে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঝুঁকি কমাতে ১৮ মাস পর এর কার্যকারিতা পাওয়া গেছে ৯০ দশমিক ৪ শতাংশ।
দীর্ঘমেয়াদি অনুসরণে (ফলোআপ) আরও ইতিবাচক ফল মিলেছে। সাড়ে চার বছর পর্যন্ত পর্যবেক্ষণে ডেঙ্গুজনিত হাসপাতালে ভর্তি প্রতিরোধে টিকাটির কার্যকারিতা ছিল ৮৪ দশমিক ১ শতাংশ। আর সাত বছর পর্যন্ত ফলোআপে চারটি সেরোটাইপের বিরুদ্ধেই ডেঙ্গু ও ডেঙ্গুজনিত হাসপাতালে ভর্তি প্রতিরোধে দীর্ঘস্থায়ী সুরক্ষা পাওয়া গেছে।
ভারতে ৪ থেকে ৬০ বছর বয়সীদের নিয়ে পরিচালিত পৃথক একটি ফেজ-৩ ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের ফলাফলও অনুমোদনের ক্ষেত্রে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। ওই গবেষণায় শিশু, কিশোর ও প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে টিকাটি নিরাপদ, সহনীয় এবং রোগ প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে তুলতে সক্ষম বলে দাবি করেছে কোম্পানিটি।
তাকেদার তথ্য অনুযায়ী, কিউডেঙ্গা ইতোমধ্যে এশিয়া, ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার ৪৩টি দেশে অনুমোদন পেয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে এ পর্যন্ত ৩ কোটি ২০ লাখের বেশি ডোজ সরবরাহ করা হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ডেঙ্গুর উচ্চ সংক্রমণ রয়েছে এমন এলাকায় কিউডেঙ্গা ব্যবহারের সুপারিশ করেছে। পাশাপাশি টিকাটি ডব্লিউএইচওর প্রি-কোয়ালিফিকেশনও অর্জন করেছে।
বর্তমানে ব্রাজিলের জাতীয় টিকাদান কর্মসূচিতে কিউডেঙ্গা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এছাড়া আর্জেন্টিনা, কলম্বিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার সরকারি টিকাদান কর্মসূচিতেও টিকাটি ব্যবহার করা হচ্ছে।
তাকেদা জানিয়েছে, ভারতে টিকাটি পর্যায়ক্রমে সহজলভ্য করতে তারা দেশটির নিয়ন্ত্রক সংস্থা, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করবে।