অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে অমর একুশে ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপন করেছে ক্যাম্বেলটাউন বাংলা স্কুল।
গত ২২ ফেব্রুয়ারী (রবিবার) সকালে স্কুল প্রাঙ্গনে ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক, অভিভাবক, কার্যকরী ও ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যবৃন্দ এবং আমন্ত্রিত অতিথিদের উপস্থিতিতে ভাষা সংগ্রামীদের স্মরণে দিনব্যাপী কর্মসূচি পালিত হয়।
সকাল সাড়ে দশটায় প্রভাত ফেরির মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। এবারের প্রভাত ফেরির উদ্বোধন করেন দেশবরেণ্য মানবাধিকার আইনজীবী, মুক্তিযুদ্ধ গবেষক, স্বাধীনতা ও একুশে পদকপ্রাপ্ত সমাজকর্মী আব্রাহাম লিংকন। প্রভাত ফেরি পুরো স্কুল প্রদক্ষিণ করে শহীদ মিনারের বেদীমূলে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে শ্রদ্ধা নিবেদন করে। এরপর বাংলা স্কুলের সাধারণ সম্পাদক রাফায়েল রোজারিও উপস্থিত সবাইকে অমর একুশে ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ২০২৬–এ স্বাগত জানান। সবাই সম্মিলিতভাবে বাংলাদেশ ও অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় সংগীত পরিবেশন করে ভাষা শহীদদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেন।

এরপর স্কুল সভাপতি ফায়সাল খালিদ শুভ’র সভাপতিত্বে “একুশের গুরুত্ব ও তাৎপর্য” শীর্ষক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনায় অংশ নেন ক্যাম্বেলটাউন সিটি কাউন্সিল–এর মেয়র ডার্সি লাউন্ডের পক্ষে কাউন্সিলর ও বাংলা স্কুলের সাবেক সভাপতি মাসুদ চৌধুরী, স্কুলের ব্যবস্থাপনা পর্ষদের সদস্য ও সাবেক সভাপতি আব্দুল জলিল এবং একুশে পদকপ্রাপ্ত মানবাধিকার কর্মী আব্রাহাম লিংকন। এ পর্যায়ে ম্যাকুয়ারী ফিল্ড নির্বাচনী এলাকার সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী আনুলাক চানটিভং-এর পাঠানো লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সভাপতি ফায়সাল খালিদ শুভ।
অনুষ্ঠানের এই অংশে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ডক্টর রফিক ইসলামকে “একুশে সম্মাননা ২০২৬” প্রদান করা হয়। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকায় তাঁর পক্ষে সম্মাননা স্মারক গ্রহণ করেন তাঁর সহধর্মিণী, বাংলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক ও বারডিয়া বাংলা পাঠশালার অধ্যক্ষ মিলি ইসলাম এবং তাঁদের দুই কন্যা রুমানা ও রেহনুমা। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা শাহাদাত হোসেন, কায়সার আহম্মেদসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।
দ্বিতীয় পর্বে বাংলা স্কুলের ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষকদের পরিবেশনায় মুগ্ধতা ছড়ায় গীতি আলেখ্য— “মায়ের ভাষা, প্রাণের ভাষা, মোদের প্রিয় বাংলা ভাষা”। গীতি আলেখ্যটির রচনা, নির্দেশনা ও পরিচালনায় ছিলেন মশিউল আযম খান স্বপন। এতে অংশ নেয় মিরাফ, অর্ক, আরহান, আরিয়া, নুসাইবা আলম, রিয়ান, রাভিভ, সামরিন, সাফরিন, গার্গী, জারা, মিনহাল, সুহানা, আমীনা, আদিয়ান, মুনাজ্জাহ, মৃন্ময়ী, দীপ্তরাজ, অনিরুদ্ধ, নাশভা, অর্ণিলা, মাহনাজ, ইমরান, রাইয়ান, অস্কার, মাহরুস, জারিফ, নুসাইবা হক, রাইনা, অর্ণা, মারজান, জেইনা ও জাহিয়া। সমন্বয়ে ছিলেন শ্রেণি শিক্ষক শায়লা ইয়াসমিন নুসরাত, অনিতা মন্ডল, বিশাখা পাল, নুসরাত মৌরি, সায়মা হক ও অনিতা বিশ্বাস মীরা। হারমোনিয়ামে ছিলেন সংগীত শিক্ষক স্বপ্না চক্রবর্তী ও নাজমুল আহসান খান, তবলায় বিজয় সাহা এবং গিটারে বনফুল বড়ুয়া।
এরপর অধ্যক্ষ রুমানা খান মোনা ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে শিক্ষার্থীদের পরিবেশনা ধৈর্য ও মনোযোগসহকারে উপভোগ করার জন্য উপস্থিত সবাইকে ধন্যবাদ জানান এবং পরিচিত সবাইকে বাংলা স্কুলে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানান। একই পর্বে We Care Bangladesh–এর উদ্যোগে অর্গান ও টিস্যু ডোনেশন বিষয়ে একটি তথ্যবহুল উপস্থাপনা দেন গবেষক ডক্টর মনিরা হক ও ফিরোজা ইয়াসমিন।
শেষ পর্বে সিডনির বরেণ্য শিল্পীদের পরিবেশনায় গান ও কবিতায় ভাষা সংগ্রামীদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। সংগীতে অংশ নেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মিজানুর রহমান তরুণ, লুৎফা খালেদ, বনফুল বড়ুয়া, নাজমুল আহসান খান ও ফায়সাল খালিদ শুভ। কবিতায় শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করেন আতিফ কাজী রহমান দৃপ্ত, মাজনুন মিজান ও আব্রাহাম লিংকন; স্বরচিত কবিতা পাঠ করেন কাজী আশফাক রহমান। এই পর্বের সঞ্চালনায় ছিলেন কাজী আশফাক রহমান। তবলায় সংগত করেন বিজয় সাহা এবং গিটারে ছিলেন বনফুল বড়ুয়া।
অনুষ্ঠানে শব্দ নিয়ন্ত্রণে দায়িত্ব পালন করেন কার্যকরী কমিটির সভাপতি ফায়সাল খালিদ শুভ, ব্যবস্থাপনা পর্ষদের সদস্য নাজমুল আহসান খান ও কার্যকরী কমিটির সদস্য মশিউল আযম খান স্বপন। কারিগরি নিয়ন্ত্রণে ছিলেন রাফায়েল রোজারিও, হিসাব রক্ষণে গোলাম মোস্তফা জিশান। শহীদ মিনার নির্মাণ ও মঞ্চসজ্জায় দায়িত্ব পালন করেন ইয়াকুব, রাফায়েল, স্বপন, শুভ, শাহিন, মইন, রঞ্জন, মৃম্ময় ও জিশান। সার্বিক ব্যবস্থাপনায় ছিলেন ইয়াকুব আলী ও নুরুল ইসলাম শাহিন।
প্রধান সমন্বয়কারী নাজমুল আহসান খানের তত্ত্বাবধানে দুপুর দুইটায় সফলভাবে সমাপ্ত হয় বাংলা স্কুলের অমর একুশে ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ২০২৬-এর আয়োজন। অনুষ্ঠান শেষে সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান সভাপতি ফায়সাল খালিদ শুভ।
উল্লেখ্য, ক্যাম্বেলটাউন বাংলা স্কুল প্রতি রবিবার সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব বাংলা ভাষাভাষীর জন্য উন্মুক্ত।