শনিবার, ২০ জুলাই ২০২৪, ০৭:২০ পূর্বাহ্ন

একটি শীতের দুপুর!

লেখক: কবিতা রায়
  • Update Time : শনিবার, ১৩ জানুয়ারী, ২০২৪
  • ১২৪ Time View

শীতকালে হরেক রকম শাকের মাঝে পালং শাকটাই বেশি আনা হয় কারণ পালং এর এই স্বাদ অন্য সময় পাওয়া যায় না।
ছিম, বেগুন,মূলা, বড়ি দিয়ে পালং শাকের ঘন্ট মজেও ভালো। তবে আজকের প্রসঙ্গ চিতল মাছের কালিয়া এবং তা সাবেকি প্রণালীতে…..
যদিও পিঁয়াজের দাম এখন অনেকটায় কমেছে বাজারে! তাও তাকে ছাড়াই করার সিদ্ধান্ত নিলাম আজও…. ভাবলাম পুরো মাছটা তো একদিনে শেষ হবে না, পরে না হয় তাকে সহই রাঁধা হবে….

৫/৬ টুকরো মাছ ধুয়ে নুন-হলুদ মেখে কড়াইয়ে তেল গরম করে হালকা ভেজে তুলে নিয়ে সেই তেলে দুইটা এলাচ, দু টুকরো দারচিনি ও একটা তেজপাতা ফোঁড়ন দিয়ে, ব্লেন্ড করে রাখা (হাফ ইঞ্চি আদা, একটা মাঝারি টমেটো, ১ চা চামচ জিরা, ১চা চামচ ধনে, ৩টা কাঁচা মরিচ ও ১চা চামচ শুকনো মরিচের , ১চা চামচ হলুদ গুঁড়া একসঙ্গে ব্লেন্ড করে) মসলা ঢেলে দিয়ে ভালো করে কসিয়ে,ইচ্ছে হলে ছাড়িয়ে রাখা কিছু মটর শুঁটি দিলেও মন্দ হবে না,এবার স্বাদমতো নুন দিয়ে দুই টে,চামচ টক দৈ ফেটিয়ে দিয়ে ২মিনিট কসিয়ে তেল বের হয়ে এলে পরিমাণ মত গরম জল দিয়ে ফুটিয়ে এবার মাছ ছেড়ে দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে।
৫ মিনিট পর ঢাকনা তুলে সামান্য চিনি, হাফ চামচ গরম মসলা বাটা / গুঁড়ো ছড়িয়ে ১মিনিট পর ১চামচ ঘি উপর থেকে চারপাশে সমান ভাবে ঘুরিয়ে নামিয়ে নিন সাবেকি চিতল মাছের কালিয়া!!

কার্তিকের এক অপরাহ্নে জন্মেছিল বলে সাধ করে হৈমন্তী নাম রেখেছিলেন বাড়ীর কর্তা!
অনেকেরই তো ফাল্গুনী, বাসন্তী,চৈতি, চৈতালি ,বৈশাখী, শ্রাবণী নাম রাখা হয় জানিনা তারা সবাই সেই স্ব স্ব মাস বা ঋতুতে জন্মেছিল কিনা!
তবে হৈমন্তী তার জন্ম কাল বা ঋতুটিকে অন্য আর সব ঋতুর চেয়ে একটু বেশিই পছন্দ করত…..
মাঠে মাঠে সোনালী ধানের রূপ- রঙ , কুয়াশার চাদরে মোড়া হালকা হিমেল হাওয়া, বৃষ্টি হীন রৌদ্রজ্জ্বল শীতল সকাল সব কিছুই ওর খুব ভালো লাগে!!
আর এই সময়টা পড়াশোনার চাপ থাকতো না বলে বান্ধবীদের সাথে খেলাধুলার পাশাপাশি জল কমে আসা পুকুরে ছিপ দিয়ে মাছ ধরতে পছন্দ করত বরাবরই…..
অনেকেই বড়শিতে জ্যান্ত পুঁটি মাছ গেঁথে কম বহর দিয়ে ছিপ ফেলে বেশ বড়সড় শোল মাছ ধরতো ওদের পুকুরে কিন্তু ওদের বাড়িতে কেউ শোল মাছ খেতে চাইতো না বলে ধরতে ইচ্ছে করেনি কখনো…..
কালেভদ্রে পেয়ে গেলেও সাথীদের দিয়ে দিতো….
অথচ বিয়ের পর জানতে পারলো তার স্বামীসহ সবারই এই শোল মাছ বড় প্রিয়!
শাশুড়ি মায়ের পিড়াপিড়িতে একদিন ভাবলো দেখাই যাক না খেয়ে তবে কালো চামড়া আর মাথা দেখলেই তার কেমন অরুচি ঠেকে!!
একদিন আঁশ ছাড়ানোর সময় গলার কাছের চামড়াটা একটু ফাঁক হয়ে যেতেই তড়িৎ বুদ্ধি খেলে গেলো আর শক্ত হাতে চামড়া ধরে টানতেই ফড়ফড় করে ছিলে ফেলল পুরো চামড়াটা…..
ব্যাস তখন থেকেই ছোট টুকরো করে একদম মাংস স্টাইলে রান্না করা আর খাওয়ার শুরু শোল মাছের কালিয়া!..
শাশুড়ি মা পেঁয়াজ খেতেন না বলে মাছ হালকা ভেজে, আলু ডুমো করে কেটে সেটাও ভেজে তুলে সেই কড়াইয়ে আরেকটু তেল দিয়ে জিরা ও গোটা গরম মসলা ফোড়ন দিয়ে বাটিতে গুলে রাখা আদা , জিরা, মরিচ ও হলুদের পেষ্ট তাতে সামান্য হিং ….
এবার মসলার মিশ্রণ ঢেলে দিয়ে একটা টমেটো কুচি ও পরিমাণ মত নুন দিয়ে কসিয়ে আলু দিয়ে নেড়েচেড়ে সামান্য গরম জল দিয়ে ঢেকে রান্না করে তেল বের হলে পরিমাণ মত জল দিয়ে ফুটিয়ে আলু সেদ্ধ হয়ে এলে মাছের টুকরা গুলো দিয়ে ফুটলে গরম মসলার গুঁড়া ও সামান্য ঘি ছড়িয়ে নামিয়ে নিন। একই ভাবে পিঁয়াজ রসুন দিয়েও করা যায় সেক্ষেত্রে হিং না দিলেও চলবে…..
একদিন কাকতালীয় ভাবে হৈমন্তীর ছোট ভাই এসেছে কি করবে সে, ভাই তো শোল মাছ খায়না কিন্তু আজ তো অন্য কিছু নেইও…..
ভয়ে ভয়ে ভাইয়ের পাতে দিয়ে বলল , বলত খেয়ে কেমন হয়েছে….
সে তো চিনতে পারছে না কাঁচুমাচু করে মুখে তুলে বলল কিরে দিদি এটা খেতে তো অসাধারণ!!
সেই থেকে সে শোল মাছের ভক্ত আর বাড়ীর পুকুরে শোল মাছ ধরা পড়লেই হৈমন্তীর ঘরে চালান হতে লাগলো….
আমার গল্পটিও এখানেই ফুরালো!
এই রান্নাটা প্রথম খেয়েছিলাম অনেক দিন আগে আমার বড় ভাইয়ের বউয়ের হাতে!
খেয়েই খুব ভালো লেগেছিল!
বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই আমরা বড় বা মাঝারি সাইজের চিংড়ি পেলেই হয় মালাইকারি নয় তো বেশী করে তেল মসলা দিয়ে ভুনা টাইপের রান্না করে থাকি।
আবার অনেকে আছে মাছ ছাড়া বিশেষ করে ছোট চিংড়ি ছাড়া কোন শাক- সব্জি রান্নাই করে না বা খায় না….
অনেকেই বড় বা মাঝারি সাইজের চিংড়ির খোসাসহ রাখতে পছন্দ করে, দেখতে বড় লাগা বা সৌন্দর্যের জন্য!
আমি বেশির ভাগ সময় ছাড়িয়ে ফেলি খাবার সুবিধার জন্য….
আজকের এই চিংড়ি গুলো মাঝারি সাইজের, বাচ্চাদের জন্য হালকা ঝাল দিয়ে ভুনা টাইপের রান্না করে দেই, কখনো মালাইকারি যদিও সব সময় নারকেলের দুধ তো থাকে না সেক্ষেত্রে নরমাল দুধ দিয়েই করি!!
আজ সেই রান্নাটা করলাম যদিও রেসিপি ওর কাছে না শুনেই নিজের মত করেই করেছি….
অনেকেই হয়তো করে তবে সেটা একটু শুকনো মত চচ্চরী টাইপের!
এটা বেশ মাখো মাখো রসালো , এক পদেই কাফি!!
ছোট করে মিষ্টি কুমড়া, আলু, পটল, ঝিঙা কেটে ধুয়ে নিয়েছি, পুঁইশাকও কেটে ধুয়ে নিয়েছি….
এবার কড়াইতে তেল গরম করে নুন হলুদ মাখানো চিংড়ি হালকা ভেজে তুলে নিয়ে সেই তেলে জিরা, শুকনা মরিচ ফোড়ন দিয়ে পেঁয়াজ কুচি দিয়ে একটু নেড়ে পুঁইশাক বাদে সব্জিগুলো দিয়ে সামান্য নাড়াচাড়া করে এক চা চামচ আদা বাটা, জিরা গুঁড়া, হলুদ গুঁড়া ও ৫/৬টি কাঁচা মরিচ( মরিচ গুঁড়াও দেয়া যায়) দিয়ে কসিয়ে পরিমাণ মত নুন দিয়ে এবার পুঁইশাক দিয়ে নেড়ে ঢেকে দিয়েছি। একটু পরে ঢাকনা তুলে যদি মনে হয় আরেকটু জল দরকার তবে গরম জল দেয়া যেতে পারে , আমি দিয়েছি।
কিছুক্ষণ পর চিংড়ি দিয়ে আরেকটু রান্না করে সামান্য জিরা ভাজার গুঁড়া ছড়িয়ে নামিয়ে দিলাম।
ফিরে গেলাম সেই দিনে, বর মশাইয়ের প্রশংসা শুনে বললাম এইটা মুক্তার কাছে শেখা……

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category