অস্ট্রেলিয়া বিশ্বের অন্যতম বহুসাংস্কৃতিক দেশ। ২০২১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, দেশটির ২৭ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ বিদেশে জন্মগ্রহণ করেছেন। একই সঙ্গে ৪৮ দশমিক ২ শতাংশ মানুষের অন্তত একজন অভিভাবক বিদেশে জন্মগ্রহণ করেছেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও সংস্কৃতি থেকে আসা মানুষের দীর্ঘদিনের বসবাস অস্ট্রেলিয়ার সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে সমৃদ্ধ করেছে।
এই বহুসাংস্কৃতিক অস্ট্রেলিয়ার ভবিষ্যৎ, বর্ণবাদ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) দেশজুড়ে রাজপথে নেমেছেন হাজারো স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী। ওয়ান নেশন নেত্রী পলিন হ্যানসনের রাজনৈতিক উত্থান এবং অভিবাসন ও বহুসাংস্কৃতিকতা নিয়ে তাঁর অবস্থানের প্রতিবাদে বিভিন্ন শহরে শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষ ছেড়ে বিক্ষোভে অংশ নেন।
ন্যাশনাল ইউনিয়ন অব স্টুডেন্টসের (এনইউএস) উদ্যোগে আয়োজিত এসব কর্মসূচিতে শিক্ষার্থীদের হাতে ছিল বর্ণবাদবিরোধী ও হ্যানসনবিরোধী বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড। বিক্ষোভে সমতা, বৈচিত্র্য, অধিকার ও বহুসাংস্কৃতিক সমাজ রক্ষার দাবি উঠে আসে।
সিডনির কেন্দ্রীয় ব্যবসায়িক এলাকায় এক হাজারের বেশি বিক্ষোভকারী সমবেত হন। তাদের হাতে পলিন হ্যানসন ও ওয়ান নেশনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড দেখা যায়। বিক্ষোভকারীরা ‘শিক্ষার্থীরা ঐক্যবদ্ধ হলে পরাজিত হবে না’ এবং ‘বর্ণবাদীদের এখানে স্বাগত নেই’সহ বিভিন্ন স্লোগান দেন।
বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, হ্যানসনের রাজনৈতিক অবস্থান অস্ট্রেলিয়ার বহুসাংস্কৃতিক সমাজের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বিশেষ করে অভিবাসন, জাতিগত পরিচয় ও অস্ট্রেলিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর ‘একক সংস্কৃতি’ বা ‘মনোকালচার’ ধারণা তরুণদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। গত জুনে ন্যাশনাল প্রেস ক্লাবে দেওয়া এক বক্তব্যে হ্যানসন অস্ট্রেলিয়ার বহুসাংস্কৃতিক নীতির সমালোচনা করে দেশকে ‘মনোকালচারাল’ সমাজে পরিণত করার কথা বলেছিলেন।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া অষ্টম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী জানান, স্কুল থেকে একদিনের ছুটি নিয়ে কর্মসূচিতে অংশ নিতে মায়ের অনুমতি পেতে তাঁকে নিজের অবস্থানের পক্ষে চার পৃষ্ঠার একটি লেখা প্রস্তুত করতে হয়েছিল। পরে তিনি মাকে রাজি করিয়ে বিক্ষোভে অংশ নেন।
বিক্ষোভে বক্তাদের বক্তব্যেও একই ধরনের বার্তা উঠে আসে। তারা বলেন, অস্ট্রেলিয়ায় বর্ণবাদ ও বৈষম্যের কোনো স্থান থাকা উচিত নয় এবং দেশের তরুণ প্রজন্ম বহুসাংস্কৃতিক সমাজ, সমতা ও সমঅধিকারের পক্ষে অবস্থান করছে।
সাবেক ভিক্টোরিয়ান গ্রিনস নেতা সামান্থা রাটনামও বিক্ষোভে শিক্ষার্থীদের ব্যাপক উপস্থিতিতে সন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, তরুণদের এই অংশগ্রহণ তাঁকে আশাবাদী করেছে এবং ওয়ান নেশনের উত্থান ঠেকানো সম্ভব। তিনি মন্তব্য করেন, ‘এই মুহূর্তে সবকিছুই ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।’
বিক্ষোভ চলাকালে ডানপন্থী সাংবাদিক অ্যাভি ইয়েমিনি সেখানে উপস্থিত হলে উত্তেজনা তৈরি হয়। তিনি বিক্ষোভস্থলে প্রবেশের চেষ্টা করলে মার্শালরা তাঁকে থামিয়ে দেন। পরে তিনি ঘটনাস্থলের পাশে দাঁড়িয়ে ভিডিও ধারণ করতে থাকেন।
এ সময় একদল শিক্ষার্থী পলিন হ্যানসনকে লক্ষ্য করে অশালীন স্লোগান দেন। বিক্ষোভের বিভিন্ন পর্যায়ে হ্যানসনবিরোধী আরও কিছু কড়া স্লোগানও শোনা যায়। তবে কর্মসূচির মূল বক্তব্য ছিল বর্ণবাদ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে অবস্থান এবং বহুসাংস্কৃতিক সমাজের পক্ষে তরুণদের দাবি।
বিক্ষোভের অন্যতম সংগঠক ও নিউ সাউথ ওয়েলস বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আভাসা বাজরাচার্য বলেন, পলিন হ্যানসনের বিরুদ্ধে তরুণদের মধ্যে যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে, এই বিক্ষোভ তারই বহিঃপ্রকাশ। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা মনে করেন, রাজনীতিতে তাদের কণ্ঠস্বরও গুরুত্বপূর্ণ এবং দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাদের উদ্বেগ প্রকাশের অধিকার রয়েছে।
সিডনির পাশাপাশি মেলবোর্ন, ব্রিসবেন, অ্যাডিলেড, পার্থসহ অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন শহর ও ছোট এলাকায় শিক্ষার্থীরা কর্মসূচিতে অংশ নেন। স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষ ছেড়ে রাস্তায় নামার ঘটনায় দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনেও ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।
অন্যদিকে, বিক্ষোভের আয়োজক ও অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের বক্তব্য, অস্ট্রেলিয়ার বহুসাংস্কৃতিক সমাজ, সমতা ও অধিকার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশের জন্য শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ একটি গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক অধিকার। তাদের দাবি, দেশটির ভবিষ্যৎ এমন একটি সমাজ হওয়া উচিত, যেখানে ভিন্ন জাতি, সংস্কৃতি ও পরিচয়ের মানুষ সমান মর্যাদা ও অধিকার নিয়ে বসবাস করতে পারেন।
তথ্যসূত্র: টিম প্রেস অস্ট্রেলিয়া (বাংলাদেশি অস্ট্রেলিয়ান জার্নালিস্ট গ্রুপ)