শ্রমিকের অধিকার আদায়ের রক্তস্নাত ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহের দিন মে দিবস পালিত হচ্ছে শ্রমিক সংগঠনগুলোর নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে।
বিশ্বের অন্যান্য দেশের মত বাংলাদেশও ১ মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতি দিবস হিসাবে পালন করছে; সরকারিভাবে এবারে মে দিবস পালিত হচ্ছে ‘সুস্থ শ্রমিক, কর্মঠ হাত; আসবে এবার নব প্রভাত’ প্রতিপাদ্য নিয়ে।
সকাল থেকে জাতীয় প্রেসক্লাব থেকে পল্টন-গুলিস্তান এলাকায় মিছিল, শোভাযাত্রা, মানববন্ধনের মতো কর্মসূচি পালন করেছে শ্রমিক সংগঠনগুলো, হয়েছে আলোচনা সভাও।
সকাল ৯টা থেকে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে বিভিন্ন সংগঠনের ব্যানারে শ্রমিক সমাবেশে যোগ দেন হাজারো শ্রমজীবী মানুষ। তাদের কারো হাতে ছিল লাল পতাকা, কারো হাতে ছিল বিভিন্ন স্লোগান খেলা ফেস্টুন।
শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদের (স্কপ) নেতারা শ্রম আইন বাস্তবায়নের পাশাপাশি শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবি জানান।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পাদিত বাণিজ্য চুক্তি বাতিল কর কর্মক্ষম সবার কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা, জাতীয় ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ এবং ‘আধুনিক দাসত্ব, মজুরি চুরি ও বাধ্যতামূলক শ্রম’ বন্ধের দাবি জানায় সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্ট।
সংগঠনের কেন্দ্রীয় প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক জুলফিকার আলী বলেন, “শ্রমিকদের দীর্ঘ সংগ্রামের ফলশ্রুতিতে সম্প্রতি বিদ্যমান শ্রম আইনে শ্রম অধিকার সম্প্রসারণের কিছু সংশোধনী আনা হলেও গণতান্ত্রিক শ্রম আইনের দাবি পূরণ হয়নি, শ্রমিকদের পক্ষে দরকষাকষি প্রতিনিধির ক্ষমতা সঙ্কুচিত হয়েছে, শ্রমিককে চাকরি থেকে বঞ্চিত করার সুযোগগুলি অব্যাহত রাখা হয়েছে, শ্রমিকের সামাজিক সুরক্ষার সম্প্রসারণ কে শর্তের অধীন রেখে সান্ত্বনা দেওয়ার ভূমিকা নেওয়া হয়েছে, শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের বিধান করা হয়নি, নির্দিষ্ট মেয়াদে মজুরি পুননির্ধারণের ব্যর্থতায় ক্ষতিপূরণের বিধান নেই।”
সংগঠনের আইন সম্পাদক অ্যাড বিমল চন্দ্র সাহা বলেন, “চব্বিশের অভ্যুত্থানে জীবনদানকারী শ্রমজীবী মানুষের বৈষম্য বিলোপের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে রাষ্ট্রের এখন পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেই। তবে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ শ্রমজীবী, তাদের প্রত্যাশা উপেক্ষা করে স্বস্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনা করা যাবে না “
শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা এবং জীবন-জীবিকার ওপর ‘সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন’ প্রতিরোধের আন্দোলন শক্তিশালী করার আহ্বান জানানো হয় সমাবেশ থেকে।
সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্টের সাধারণ সম্পাদক আহসান হাবিব বুলবুলের সভাপত্বিতে এবং সাংগঠনিক সম্পাদক খালেকুজ্জামান লিপনের পরিচালনায় সমাবেশে বক্তব্য দেন নির্বাহী সদস্য আফজাল হোসেন, বাংলাদেশ ফার্মাসিউটিক্যালস ওয়ার্কার্স অ্যান্ড এমপ্লয়িজ ফেডারেশনের সভাপতি মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর, বাংলাদেশ ট্যুরিজম ওয়ার্কার্স অ্যান্ড এমপ্লয়িজ ফেডারেশনের আহ্বায়ক রাশেদুর রহমান রাশেদ, রিকশা, ব্যটারি রিকশা,ইজিবাইক সংগ্রাম পরিষদের জালাল আহমেদ ও দাউদ আলী মামুন, ঢাকা জেলা ট্যাক্সি কার, অটোরিকশা চালক শ্রমিক ইউনিয়নের সহ-সভাপতি আলমগীর হোসেন, বোম্বে সুইটস অ্যান্ড কোম্পানি শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি রতন মিয়া।
বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশনে (টাফ), কর্মজীবী নারী, জাগো বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশন, বাংলাদেশ সরকারি কর্মচারী দাবি আদায় ঐক পরিষদ, বাংলাদেশ শ্রমিক ফেডারেশন (বাজাফে-১৭) আরও কিছু সংগঠন আলাদাভাবে সমাবেশ করে।
১৮৮৬ সালে আমেরিকার শিকাগো শহরে হে মার্কেটের শ্রমিকরা শ্রমের ন্যায্য মূল্য এবং আট ঘণ্টা কাজের সময় নির্ধারণ করার দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোলে।
আন্দোলন দমনে সেদিন শ্রমিকদের ওপর গুলি চালানো হয়। ১০ শ্রমিকের আত্মত্যাগে গড়ে ওঠে বিক্ষোভ। প্রবল জনমতের মুখে যুক্তরাষ্ট্র সরকার শ্রমিকদের আট ঘণ্টা কাজের সময় নির্ধারণ করতে বাধ্য হয়।
১৮৮৯ সালের ১৪ জুলাই ফ্রান্সের প্যারিসে আন্তর্জাতিক শ্রমিক সম্মেলনে শিকাগোর শ্রমিকদের সংগ্রামী ঐক্যের অর্জনকে স্বীকৃতি দিয়ে ১ মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতি দিবস ঘোষণা করা হয়।
১৮৯০ সাল থেকে সারাবিশ্বে শ্রমিক সংহতির আন্তর্জাতিক দিবস হিসেবে মে মাসের ১ তারিখে ‘মে দিবস’ পালিত হচ্ছে।