বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬, ০৯:৪০ অপরাহ্ন

চীনের অর্থনৈতিক সংস্কারের রূপকার ঝু রোংজি আর নেই

Reporter Name
  • Update Time : বুধবার, ১২ আগস্ট, ২০২৬
  • ১ Time View

চীনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ঝু রোংজি মারা গেছেন। বুধবার (১২ আগস্ট) অসুস্থতাজনিত কারণে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর বয়স হয়েছিল ৯৭ বছর।

১৯৯৮ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত চীনের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা ঝু রোংজি দেশটির অর্থনৈতিক সংস্কারের অন্যতম প্রধান রূপকার হিসেবে পরিচিত। দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান, কেন্দ্রীয় পরিকল্পনাভিত্তিক অর্থনীতিতে সংস্কার এবং রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর (SOE) পুনর্গঠনে তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

চীনের অর্থনীতিকে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করার ক্ষেত্রেও ঝুর অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। ২০০১ সালে চীনের বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (WTO) যোগদানের জন্য দীর্ঘ ও কঠিন আলোচনায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্ব দেন। এর ফলে বৈশ্বিক বাণিজ্যে চীনের অংশগ্রহণ আরও বাড়ে এবং দেশটির অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের সূচনা হয়।

১৯৯৭ সালে হংকং চীনের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া নির্বিঘ্ন রাখতেও ঝু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। একই বছর এশিয়ার আর্থিক সংকট মোকাবিলায় চীনের নীতি নির্ধারণেও তিনি নেতৃত্ব দেন।

বুধবার চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়া প্রকাশিত সরকারি শোকবার্তায় ঝু রোংজিকে কমিউনিস্ট পার্টির ‘অসাধারণ সদস্য’, ‘বিশ্বস্ত কমিউনিস্ট যোদ্ধা’, ‘অসাধারণ বিপ্লবী ও রাষ্ট্রনায়ক’ এবং ‘দল ও রাষ্ট্রের অসাধারণ নেতা’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।

শোকবার্তায় বলা হয়, এশিয়ার আর্থিক সংকটের ব্যাপক প্রভাব মোকাবিলায় ঝু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। একই সঙ্গে হংকংয়ের আন্তর্জাতিক আর্থিক কেন্দ্র হিসেবে সমৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতেও তিনি কাজ করেন।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি স্থিতিশীল রাখতে ঝু সক্রিয় রাজস্ব ও মুদ্রানীতি গ্রহণ করেছিলেন। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান সংস্কারের ক্ষেত্রে তিনি মালিকানার অধিকার স্পষ্ট করা এবং সরকারি প্রশাসন থেকে ব্যবসায়িক কার্যক্রম আলাদা করার ওপর জোর দেন।

১৯৯০-এর দশকে চীনের অর্থনীতি উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বাড়তে থাকা ঋণ এবং রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর বড় ধরনের লোকসানের চাপে ছিল। এ পরিস্থিতিতে ঝু রাজস্বনীতি আরও কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো এবং লোকসানে থাকা প্রতিষ্ঠান বন্ধ বা বেসরকারি খাতে হস্তান্তরের উদ্যোগ নেন।

এ সময় বিপুলসংখ্যক শ্রমিক চাকরি হারালেও তাঁদের পুনরায় কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা এবং সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

১৯৯৮ সালে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ঝু বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও শিক্ষার সঙ্গে অর্থনীতির সমন্বয় বাড়াতে একটি জাতীয় পর্যায়ের শীর্ষ কমিটি গঠন ও নেতৃত্ব দেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল বিজ্ঞান ও শিক্ষাকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করে দেশের দীর্ঘমেয়াদি সমৃদ্ধি নিশ্চিত করা।

ঝু রোংজির সর্বশেষ প্রকাশ্য উপস্থিতি ছিল ২০১৮ সালের অক্টোবরে। ওই সময় বেইজিংয়ে সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ইকোনমিক্স অ্যান্ড ম্যানেজমেন্টের উপদেষ্টা বোর্ডের সদস্যদের সঙ্গে তিনি সাক্ষাৎ করেন।

ওই বৈঠকে সাবেক মার্কিন অর্থমন্ত্রী হেনরি পলসন, অ্যাপলের প্রধান নির্বাহী টিম কুক এবং তৎকালীন আইবিএমের প্রধান নির্বাহী জিনি রোমেটিও উপস্থিত ছিলেন।

১৯২৮ সালে চীনের হুনান প্রদেশের রাজধানী চাংশায় জন্মগ্রহণ করেন ঝু রোংজি। ১৯৫১ সালে সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তড়িৎ প্রকৌশলে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি সরকারি চাকরিতে যোগ দেন।

পরবর্তী সময়ে আঞ্চলিক ও জাতীয় পর্যায়ের অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণের সঙ্গে যুক্ত হন তিনি। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত চীনের অর্থনীতিবিষয়ক উপপ্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ১৯৯৮ সালে দেশটির প্রধানমন্ত্রী হন।

২০০৩ সালের মার্চে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে অবসর নেওয়ার পরও চীনের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের বিভিন্ন উদ্যোগকে সমর্থন দিয়ে যান ঝু। সরকারি শোকবার্তায় বলা হয়েছে, অবসরের পরও তিনি অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সরকারি কর্মকর্তাদের সততা এবং দুর্নীতিবিরোধী কর্মকাণ্ড নিয়ে আগ্রহী ছিলেন।

সাধারণ মানুষের প্রতি ঝুর গভীর দায়বদ্ধতার কথাও শোকবার্তায় তুলে ধরা হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তাদের জনগণের সেবক হিসেবে কাজ করা, সত্য কথা বলা, বিশেষ সুবিধা না নেওয়া এবং কঠিন দায়িত্ব সাহসের সঙ্গে পালনের ওপর তিনি গুরুত্ব দিতেন।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category