বৃহস্পতিবার, ০৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১১:০৪ পূর্বাহ্ন

অনলাইন আসক্তির নীরব ট্র্যাজেডি: গাজিয়াবাদে নয় তলা থেকে লাফিয়ে প্রাণ গেল তিন কিশোরী বোনের

Reporter Name
  • Update Time : বৃহস্পতিবার, ৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৪ Time View

ডিজিটাল বিনোদন কখন যে শিশু কিশোরের মানসিক জগৎ গ্রাস করে নেয়, তা অনেক সময় বাবা

মায়ের চোখের সামনেই ঘটে তবু বোঝা যায় না। ভারতের উত্তর প্রদেশের গাজিয়াবাদে তিন কিশোরী বোনের মর্মান্তিক মৃত্যু সেই ভয়াবহ বাস্তবতারই নির্মম সতর্কবার্তা।

ভারতের উত্তর প্রদেশের গাজিয়াবাদে একটি আবাসিক ভবনের নবম তলার ফ্ল্যাট থেকে লাফিয়ে আত্মহত্যা করেছে তিন বোন। নিহতদের বয়স যথাক্রমে ১২, ১৪ ও ১৬ বছর। গত মঙ্গলবার ৩ ফেব্রুয়ারি গভীর রাতে ঘটে যাওয়া এই হৃদয়বিদারক ঘটনায় গোটা এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে।

পুলিশ ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, তিন বোন দীর্ঘদিন ধরে অনলাইনে কোরীয়ান গেম ও সংস্কৃতিতে অতিমাত্রায় আসক্ত ছিল। লাফ দেওয়ার আগে তারা একটি হাতে লেখা সুইসাইড নোট রেখে যায়, যেখানে লেখা ছিল ‘সরি পাপা’। নোটটির সঙ্গে একটি কান্নার ইমোজিও আঁকা ছিল। এছাড়া একটি পকেট ডায়েরিতে আট পৃষ্ঠাজুড়ে তাদের গেমিং অভ্যাস, মোবাইল ফোন ব্যবহারের বিবরণ এবং মানসিক অবস্থার কথা লেখা ছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ।

ঘটনার রাতে তিন বোন ফ্ল্যাটের বারান্দায় গিয়ে দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে দেয়। পরে জানালা দিয়ে একে একে নিচে লাফ দেয় তারা। তাদের চিৎকার ও নিচে পড়ার শব্দে মা বাবা, প্রতিবেশী এবং আবাসন কমপ্লেক্সের নিরাপত্তাকর্মীদের ঘুম ভেঙে যায়। দরজা ভেঙে বারান্দায় ঢোকা হলেও ততক্ষণে সব শেষ হয়ে যায়।

সহকারী পুলিশ কমিশনার অতুল কুমার সিং বলেন,
“ঘটনাস্থলে পৌঁছে আমরা নিশ্চিত হই যে চেতন কুমারের তিন মেয়ে ভবন থেকে লাফিয়ে মারা গেছে।”
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিন বোন একটি তথাকথিত ‘কোরিয়ান লাভ গেম’ এ গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েছিল। তারা নিজেদের কোরীয়ান নামও রেখেছিল এবং প্রায় সব কাজ একসঙ্গে করত। কোভিড-১৯ মহামারির সময় থেকেই তাদের এই আসক্তি শুরু হয়। দুই বছর আগে তারা স্কুলে যাওয়া পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়।

পুলিশের ধারণা, মেজ বোন প্রাচী (১৪) পরিবার ও গেমিং দুই ক্ষেত্রেই নেতৃত্ব দিত। সম্প্রতি মা বাবা তাদের মোবাইল ফোন ব্যবহার সীমিত করে দেন। কয়েক দিন ফোন ব্যবহার করতে না পারায় তারা মানসিকভাবে চরমভাবে ভেঙে পড়ে বলে ধারণা করছে পুলিশ।

ঘরের দেয়ালে লেখা পাওয়া গেছে—
‘I am very lonely’
‘My heart is broken’

যা তাদের মানসিক সংকটের গভীরতা স্পষ্ট করে।

মেয়েদের বাবা চেতন কুমার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন,
“ওরা বলেছিল কোরিয়াই আমাদের জীবন। আমরা এটা ছাড়তে পারব না। এমন ঘটনা যেন আর কোনো বাবা মায়ের জীবনে না আসে।” তিনি অভিভাবকদের প্রতি সন্তানদের অনলাইন গেমিং ও মোবাইল ব্যবহারের বিষয়ে সচেতন থাকার আহ্বান জানান।

পুলিশের তথ্য‍ মতে , নিহত তিন কন্যার বাবা চেতন কুমারের দু’বার বিয়ে হয়েছিল। প্রথম স্ত্রীর একটি কন্যা এবং দ্বিতীয় স্ত্রীর দুই কন্যা এই তিন বোনই আত্মহত্যার ঘটনায় প্রাণ হারায়।

সিনিয়র পুলিশ কর্মকর্তা নিমিশ প্যাটেল জানান, এখনো নির্দিষ্ট কোনো গেমের নাম নিশ্চিত হওয়া যায়নি। উদ্ধার করা সুইসাইড নোট ও ডায়েরির তথ্য বিশ্লেষণ করে তদন্ত চলছে। সাইবার বিশেষজ্ঞরা অনলাইন ইতিহাস বিশ্লেষণে সহায়তা করবেন। তবে এখনই নিশ্চিত করে বলা যায় না যে আত্মহত্যার কারণ অনলাইন গেমিং আসক্তি।”

এই তিনটি কিশোরীর আত্মহত্যা শুধু একটি পরিবারের শোক নয়, সমাজের জন্য কঠিন প্রশ্ন!!!!

এই ঘটনা আবারও প্রশ্ন তুলে দিয়েছে শিশু ও কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়ে আমরা কতটা সচেতন। প্রযুক্তির সুবিধার পাশাপাশি এর অদৃশ্য ঝুঁকি সম্পর্কে অভিভাবক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সম্মিলিত দায়িত্ব এখন সময়ের দাবি।

গাজিয়াবাদের এই ট্র্যাজেডি যেন কেবল আরেকটি সংবাদ হয়ে না থাকে; বরং এটি হয়ে উঠুক অনলাইন আসক্তি, মানসিক অবহেলা এবং পারিবারিক সংযোগের ঘাটতি নিয়ে জাতীয় পর্যায়ের এক জরুরি সতর্ক সংকেত।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category